ঢাকা 5:11 am, Friday, 27 February 2026

পরমত সহিষ্ণুতা: সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের কার্যকর ভিত্তি

সমাজে ভিন্নমত থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। মতের ভিন্নতা মানেই বিভেদ নয়; বরং তা সৃজনশীলতার উৎস। যে সমাজ ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখে, সে সমাজই টেকসই উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তির পথে এগোয়। পরমত সহিষ্ণুতা তাই কেবল নৈতিক গুণ নয়; এটি সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা।
মতের ভিন্নতা: অগ্রগতির চালিকা শক্তি

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—চিন্তার বৈচিত্র্য থেকেই জ্ঞানচর্চা ও উদ্ভাবনের বিস্তার ঘটেছে। প্রাচীন দার্শনিক ঐতিহ্য থেকে আধুনিক গণতন্ত্র পর্যন্ত—বিতর্ক, প্রশ্ন ও সমালোচনাই উন্নতির সোপান রচনা করেছে। মতের পার্থক্যকে দমন না করে সংলাপের মাধ্যমে গ্রহণ করলে সামাজিক দ্বন্দ্ব কমে, নীতিনির্ধারণ হয় অধিক বাস্তবসম্মত, এবং নাগরিক আস্থা দৃঢ় হয়।

রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সহিষ্ণুতা; গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাণ হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। সংসদ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ—সবখানেই পরমত সহিষ্ণুতা চর্চা না হলে প্রতিষ্ঠানগুলো আস্থাহীনতায় ভোগে। ভিন্ন মতকে ‘শত্রুতা’ হিসেবে দেখার প্রবণতা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে; আর মতের বৈচিত্র্যকে ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখার মানসিকতা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে।

সামাজিক সম্প্রীতি ও ন্যায়বোধ

ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা রাজনৈতিক মত—এই বহুত্বই আমাদের সমাজের সৌন্দর্য। সহিষ্ণুতা মানে নিজের বিশ্বাস বিসর্জন দেওয়া নয়; বরং অন্যের বিশ্বাসের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। যখন আমরা ব্যক্তি-মানুষের মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিই, তখন সহিংসতা ও বিদ্বেষের জায়গা সঙ্কুচিত হয়। সামাজিক সম্প্রীতি তখনই টিকে থাকে, যখন ভিন্নতার মাঝেও মানবিক বন্ধন অটুট থাকে।

শিক্ষায় ও পরিবারে সহিষ্ণুতা চর্চা

সহিষ্ণুতার বীজ রোপিত হয় পরিবার ও শিক্ষাঙ্গনে। শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করতে শেখে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে অধিক মানবিক ও দায়িত্বশীল। পাঠ্যক্রমে সমালোচনামূলক চিন্তা, বিতর্ক ও দলগত কাজের সুযোগ বাড়ানো—সহিষ্ণু নাগরিক গঠনের অন্যতম পথ।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

ডিজিটাল যুগে তথ্যের বন্যার সঙ্গে বিভ্রান্তিও বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ও উসকানিমূলক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই প্রয়োজন সচেতনতা, তথ্য-যাচাই সংস্কৃতি এবং আইনের ন্যায্য প্রয়োগ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের দায়িত্ব—ভাষা ও আচরণে সংযম প্রদর্শন করা, যাতে বিভাজন নয়, ঐক্য জোরদার হয়।

পরিশেষে

পরমত সহিষ্ণুতা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; এটি শক্তির প্রকাশ। যে রাষ্ট্র ভিন্নমতকে ধারণ করতে পারে, সে রাষ্ট্রই স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ হয়। সমাজের প্রতিটি স্তরে—পরিবার, শিক্ষা, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে—সহিষ্ণুতার চর্চা বাড়াতে পারলেই আমরা গড়ে তুলতে পারব ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও উন্নয়নমুখী এক ভবিষ্যৎ।

পরমতকে স্থান দেওয়া মানে নিজের অবস্থান হারানো নয়; বরং বৃহত্তর কল্যাণের পথে একসাথে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

পরমত সহিষ্ণুতা: সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের কার্যকর ভিত্তি

আপডেট সময় : 08:33:24 am, Thursday, 26 February 2026

সমাজে ভিন্নমত থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। মতের ভিন্নতা মানেই বিভেদ নয়; বরং তা সৃজনশীলতার উৎস। যে সমাজ ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখে, সে সমাজই টেকসই উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তির পথে এগোয়। পরমত সহিষ্ণুতা তাই কেবল নৈতিক গুণ নয়; এটি সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা।
মতের ভিন্নতা: অগ্রগতির চালিকা শক্তি

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—চিন্তার বৈচিত্র্য থেকেই জ্ঞানচর্চা ও উদ্ভাবনের বিস্তার ঘটেছে। প্রাচীন দার্শনিক ঐতিহ্য থেকে আধুনিক গণতন্ত্র পর্যন্ত—বিতর্ক, প্রশ্ন ও সমালোচনাই উন্নতির সোপান রচনা করেছে। মতের পার্থক্যকে দমন না করে সংলাপের মাধ্যমে গ্রহণ করলে সামাজিক দ্বন্দ্ব কমে, নীতিনির্ধারণ হয় অধিক বাস্তবসম্মত, এবং নাগরিক আস্থা দৃঢ় হয়।

রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সহিষ্ণুতা; গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাণ হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। সংসদ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ—সবখানেই পরমত সহিষ্ণুতা চর্চা না হলে প্রতিষ্ঠানগুলো আস্থাহীনতায় ভোগে। ভিন্ন মতকে ‘শত্রুতা’ হিসেবে দেখার প্রবণতা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে; আর মতের বৈচিত্র্যকে ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখার মানসিকতা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে।

সামাজিক সম্প্রীতি ও ন্যায়বোধ

ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা রাজনৈতিক মত—এই বহুত্বই আমাদের সমাজের সৌন্দর্য। সহিষ্ণুতা মানে নিজের বিশ্বাস বিসর্জন দেওয়া নয়; বরং অন্যের বিশ্বাসের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। যখন আমরা ব্যক্তি-মানুষের মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিই, তখন সহিংসতা ও বিদ্বেষের জায়গা সঙ্কুচিত হয়। সামাজিক সম্প্রীতি তখনই টিকে থাকে, যখন ভিন্নতার মাঝেও মানবিক বন্ধন অটুট থাকে।

শিক্ষায় ও পরিবারে সহিষ্ণুতা চর্চা

সহিষ্ণুতার বীজ রোপিত হয় পরিবার ও শিক্ষাঙ্গনে। শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করতে শেখে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে অধিক মানবিক ও দায়িত্বশীল। পাঠ্যক্রমে সমালোচনামূলক চিন্তা, বিতর্ক ও দলগত কাজের সুযোগ বাড়ানো—সহিষ্ণু নাগরিক গঠনের অন্যতম পথ।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

ডিজিটাল যুগে তথ্যের বন্যার সঙ্গে বিভ্রান্তিও বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ও উসকানিমূলক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই প্রয়োজন সচেতনতা, তথ্য-যাচাই সংস্কৃতি এবং আইনের ন্যায্য প্রয়োগ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের দায়িত্ব—ভাষা ও আচরণে সংযম প্রদর্শন করা, যাতে বিভাজন নয়, ঐক্য জোরদার হয়।

পরিশেষে

পরমত সহিষ্ণুতা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; এটি শক্তির প্রকাশ। যে রাষ্ট্র ভিন্নমতকে ধারণ করতে পারে, সে রাষ্ট্রই স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ হয়। সমাজের প্রতিটি স্তরে—পরিবার, শিক্ষা, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে—সহিষ্ণুতার চর্চা বাড়াতে পারলেই আমরা গড়ে তুলতে পারব ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও উন্নয়নমুখী এক ভবিষ্যৎ।

পরমতকে স্থান দেওয়া মানে নিজের অবস্থান হারানো নয়; বরং বৃহত্তর কল্যাণের পথে একসাথে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।