ঢাকা 4:53 am, Sunday, 1 March 2026

“টার্গেটের নিচে চাপা পড়া স্বপ্ন”

অমানবিক টার্গেটের চাপে স্বপ্নের অপমৃত্যু
বেসরকারি চাকরির বাস্তবতা ও এক প্রজন্মের নীরব সংগ্রাম।

পৃথিবী নিঃসন্দেহে এক রহস্যময় জায়গা। কিন্তু এ দেশে শিক্ষিত তরুণদের কাছে সবচেয়ে বড় রহস্য—চাকরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হাতে নিয়েও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঘুরপাক খায় হাজারো স্বপ্ন।

আমাদের গ্রামের এক তরুণ—ধরা যাক তার নাম রাতুল। মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর সরকারি চাকরির আশায় বহু পরীক্ষা দিল, কোচিং করল, আবেদন ফি দিল। কোথাও প্রতারণা, কোথাও অস্বচ্ছতা। সময় গড়াল, বয়স বাড়ল, পরিবারে দায়িত্বও বাড়ল। অসুস্থ বাবা, ওষুধনির্ভর মা—সব মিলিয়ে তাকে দ্রুত আয়ের পথে নামতেই হলো।
অবশেষে একটি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিতে রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে চাকরি পেল। বেতন মন্দ নয়—মাসিক ২০ হাজার টাকা, সঙ্গে ভাতা। পরিবারে স্বস্তির নিঃশ্বাস।

কিন্তু এই স্বস্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী।

টার্গেটের অদৃশ্য শৃঙ্খল

বেসরকারি চাকরির বাস্তবতা অনেকটাই “টার্গেট”-নির্ভর। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক ডাক্তার ভিজিট, নির্দিষ্ট অর্ডার, ব্যবস্থাপত্রের ছবি, বাজার কভারেজ—সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল। প্রথমে চাপ কম থাকলেও কয়েক মাসের মধ্যে টার্গেট বেড়ে যায় অস্বাভাবিক মাত্রায়।

কোম্পানির যুক্তি সহজ—উচ্চ লক্ষ্য দিলে অন্তত অর্ধেক পূরণ হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাজারে আন্ডাররেট, অনৈতিক প্রতিযোগিতা, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য—সব মিলিয়ে সৎভাবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

টার্গেট পূরণ না হলে সতর্কবার্তা, শো-কজ, বদলি বা চাকরি হারানোর ভয়—এ যেন প্রতিদিনের সঙ্গী।
অর্থনৈতিক চাপ ও মানসিক অবসাদ।

প্রথম কয়েক মাস নিয়মিত বেতন পেলেও পরে বাজেট অ্যাচিভমেন্টের চাপে নিজের বেতন থেকেই ঘাটতি পূরণ করতে হয় অনেককে। ধীরে ধীরে ঋণের বোঝা বাড়ে। পরিবার ভাবে—“চাকরি তো হয়েছে, আগের মতো টাকা দিচ্ছে না কেন?” কিন্তু ভেতরের সংকট অদৃশ্যই থেকে যায়।

চাপ, অপমান, অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। অনেকেই ঘুমের ওষুধে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, কেউ কেউ ধূমপানে আসক্ত হয়। কর্মক্ষমতা কমে গেলে আবার বাড়ে প্রশাসনিক চাপ—এক ভয়াবহ চক্র।

সড়ক দুর্ঘটনা ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশ

টার্গেট পূরণের তাগিদে দিন-রাত মোটরসাইকেলে ছুটে চলা এসব তরুণের সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও নেই কার্যকর সুরক্ষা। অতিরিক্ত চাপ ও মানসিক অস্থিরতার মাঝে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রতিদিন সংবাদপত্রে ছাপা হয় এমন বহু দুর্ঘটনার খবর—যার পেছনে থাকে অনিরাপদ কর্মচাপের গল্প।
প্রশ্ন রয়ে যায়

একজন শিক্ষিত তরুণের জীবন কি শুধুই সংখ্যার খেলা?
টার্গেট কি মানুষের জীবনের চেয়ে বড়?
একটি কোম্পানির মুনাফার জন্য কতটা মানসিক ও সামাজিক মূল্য দিতে হচ্ছে এক প্রজন্মকে?
বেসরকারি খাত অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু মানবিক কর্মপরিবেশ, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
আজ হাজারো রাতুলের স্বপ্ন অমানবিক ব্যবস্থার চাপে ভেঙে যাচ্ছে।
যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, তবে হারিয়ে যাবে এক প্রজন্মের সম্ভাবনা।
স্বপ্নের অপমৃত্যু রোধ করতে হলে—মানুষকে আগে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে, শুধু “টার্গেট পূরণকারী কর্মী” হিসেবে নয়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

“টার্গেটের নিচে চাপা পড়া স্বপ্ন”

আপডেট সময় : 05:30:34 pm, Saturday, 28 February 2026

অমানবিক টার্গেটের চাপে স্বপ্নের অপমৃত্যু
বেসরকারি চাকরির বাস্তবতা ও এক প্রজন্মের নীরব সংগ্রাম।

পৃথিবী নিঃসন্দেহে এক রহস্যময় জায়গা। কিন্তু এ দেশে শিক্ষিত তরুণদের কাছে সবচেয়ে বড় রহস্য—চাকরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হাতে নিয়েও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঘুরপাক খায় হাজারো স্বপ্ন।

আমাদের গ্রামের এক তরুণ—ধরা যাক তার নাম রাতুল। মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর সরকারি চাকরির আশায় বহু পরীক্ষা দিল, কোচিং করল, আবেদন ফি দিল। কোথাও প্রতারণা, কোথাও অস্বচ্ছতা। সময় গড়াল, বয়স বাড়ল, পরিবারে দায়িত্বও বাড়ল। অসুস্থ বাবা, ওষুধনির্ভর মা—সব মিলিয়ে তাকে দ্রুত আয়ের পথে নামতেই হলো।
অবশেষে একটি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিতে রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে চাকরি পেল। বেতন মন্দ নয়—মাসিক ২০ হাজার টাকা, সঙ্গে ভাতা। পরিবারে স্বস্তির নিঃশ্বাস।

কিন্তু এই স্বস্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী।

টার্গেটের অদৃশ্য শৃঙ্খল

বেসরকারি চাকরির বাস্তবতা অনেকটাই “টার্গেট”-নির্ভর। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক ডাক্তার ভিজিট, নির্দিষ্ট অর্ডার, ব্যবস্থাপত্রের ছবি, বাজার কভারেজ—সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল। প্রথমে চাপ কম থাকলেও কয়েক মাসের মধ্যে টার্গেট বেড়ে যায় অস্বাভাবিক মাত্রায়।

কোম্পানির যুক্তি সহজ—উচ্চ লক্ষ্য দিলে অন্তত অর্ধেক পূরণ হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাজারে আন্ডাররেট, অনৈতিক প্রতিযোগিতা, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য—সব মিলিয়ে সৎভাবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

টার্গেট পূরণ না হলে সতর্কবার্তা, শো-কজ, বদলি বা চাকরি হারানোর ভয়—এ যেন প্রতিদিনের সঙ্গী।
অর্থনৈতিক চাপ ও মানসিক অবসাদ।

প্রথম কয়েক মাস নিয়মিত বেতন পেলেও পরে বাজেট অ্যাচিভমেন্টের চাপে নিজের বেতন থেকেই ঘাটতি পূরণ করতে হয় অনেককে। ধীরে ধীরে ঋণের বোঝা বাড়ে। পরিবার ভাবে—“চাকরি তো হয়েছে, আগের মতো টাকা দিচ্ছে না কেন?” কিন্তু ভেতরের সংকট অদৃশ্যই থেকে যায়।

চাপ, অপমান, অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। অনেকেই ঘুমের ওষুধে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, কেউ কেউ ধূমপানে আসক্ত হয়। কর্মক্ষমতা কমে গেলে আবার বাড়ে প্রশাসনিক চাপ—এক ভয়াবহ চক্র।

সড়ক দুর্ঘটনা ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশ

টার্গেট পূরণের তাগিদে দিন-রাত মোটরসাইকেলে ছুটে চলা এসব তরুণের সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও নেই কার্যকর সুরক্ষা। অতিরিক্ত চাপ ও মানসিক অস্থিরতার মাঝে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রতিদিন সংবাদপত্রে ছাপা হয় এমন বহু দুর্ঘটনার খবর—যার পেছনে থাকে অনিরাপদ কর্মচাপের গল্প।
প্রশ্ন রয়ে যায়

একজন শিক্ষিত তরুণের জীবন কি শুধুই সংখ্যার খেলা?
টার্গেট কি মানুষের জীবনের চেয়ে বড়?
একটি কোম্পানির মুনাফার জন্য কতটা মানসিক ও সামাজিক মূল্য দিতে হচ্ছে এক প্রজন্মকে?
বেসরকারি খাত অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু মানবিক কর্মপরিবেশ, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
আজ হাজারো রাতুলের স্বপ্ন অমানবিক ব্যবস্থার চাপে ভেঙে যাচ্ছে।
যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, তবে হারিয়ে যাবে এক প্রজন্মের সম্ভাবনা।
স্বপ্নের অপমৃত্যু রোধ করতে হলে—মানুষকে আগে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে, শুধু “টার্গেট পূরণকারী কর্মী” হিসেবে নয়।